রোহিঙ্গাদের টার্গেট সিলেট!

2017-09-25 by  

মায়ানমারের রাখাইন ও আরাকান রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর চলছে স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহতম গণহত্যা, নির্যাতন, নিপীড়ন। গত বেশ কিছুদিন ধরেই দেশটির সেনাবাহিনী, তাদের সহযোগী মগ সম্প্রদায় এবং কতিপয় বৌদ্ধ দুষ্কৃতিকারীদের হামলা, আক্রমণে দিশেহারা অসহায় লাখো রোহিঙ্গার আশ্রয় এখন বাংলাদেশে। চট্টগ্রামের কক্সাবাজার জেলার টেকনাফে শরণার্থী ক্যাম্পে রাখা হয়েছে রোহিঙ্গাদের। কিন্তু বিভিন্ন কৌশলে সেই ক্যাম্প থেকে ছড়িয়ে পড়ছে রোহিঙ্গারা। দেশের বিভিন্ন স্থানের মতো তারা আসছে সিলেটেও। ইতিমধ্যেই বৃহত্তর সিলেটে বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গা পুলিশের হাতে আটক হয়েছেন। তাদের ফেরত পাঠানো হয়েছে ওই শরণার্থী ক্যাম্পে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, রোহিঙ্গাদের বিষয়ে তারা সতর্ক রয়েছেন। সিলেটের কোথাও কোনো রোহিঙ্গা পাওয়া গেলে, তাকে শরণার্থী ক্যাম্পে ফেরত পাঠানো হবে। এমনকি রোহিঙ্গারা যাতে বাসা-বাড়ি ভাড়া নিতে না পারে, সে ব্যাপারেও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

জানা যায়, গত ৩ আগস্ট ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র ও জন্ম নিবন্ধন সনদ দিয়ে পাসপোর্ট বানাতে গিয়ে সিলেট পাসপোর্ট অফিসে ধরা পড়েন দুই রোহিঙ্গা নারী। তারা নিজেদের সিলেট নগরীর রায়নগর এলাকার মিতালী ৫ নম্বর বাসার বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন ও নার্গিস হোসেনের মেয়ে মনোয়ারা বেগম এবং আরেকজন একই এলাকার মিতালী ৫৬ নম্বর বাসার চতুর্থ তলার শেখ মাহমুদ হাছান ও হামিদা বেগমের মেয়ে মর্জিনা বেগম পরিচয় দিয়ে ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র ও জন্ম নিবন্ধন সনদ তৈরী করেছিলেন। কিন্তু নগরীর মোগলাবাজার থানা পুলিশ তাদের আটক করে।

গত ১৪ সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার উত্তর বড়দল ইউনিয়নের গুটিলা গ্রাম থেকে ১২ রোহিঙ্গাকে আটক করে পুলিশ। এরা সেখানে নাগরিকত্ব সনদপত্রও সংগ্রহ করে ফেলেছিলেন। আটককৃতরা ছিলেন-  মায়ানমারের আকিদা জেলার মংদু থানার কুয়ান শিবং গ্রামের আব্দুস সবুর, তার স্ত্রী আমিনা বেগম, ছেলে আব্দুল হালিম, আসলাম শাহ, মেয়ে হালিমাতুস সাহিয়া, তালিহা আক্তার, হারিসা আক্তার, উম্মে বেগম, আব্দুল হালিমের স্ত্রী উম্মুল খাইরিন, মেয়ে মোশাররফা ও শ্যালক কাওসার মিয়া। এরা সবাই একই পরিবারের সদস্য। পরদিন (১৫ সেপ্টেম্বর) পুলিশ প্রহরায় এদের সবাইকে চট্টগ্রামের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে পাঠানো হয়।

এদিকে, গতকাল রবিবার সিলেট ও শ্রীমঙ্গলে দুই রোহিঙ্গা শিশু-কিশোর আটক হয়েছে। শ্রীমঙ্গলের উপজেলার মুসলিমবাগ এলাকা থেকে জেহাদুল ইসলামকে নামের ১১ বছরের এক রোহিঙ্গা শিশুকে আটক করে পুলিশ। জেহাদুল পুলিশকে জানিয়েছে, সে মায়ানমারের আরাকান রাজ্যের মংডু গ্রামের বাসিন্দা। তার বাবার নাম জসিম উদ্দিন ও মায়ের নাম শাহিনা আক্তার। তার বাবা ও মাকে মায়ানমার সেনাবাহিনীর সহযোগী মগ’রা হত্যা করেছে বলেও জানায় জেহাদুল।

শ্রীমঙ্গল থানার ওসি কেএম নজরুল বলেন, ‘গত মঙ্গলবার শিশুটিসহ আরো ২০-২২ জন রোহিঙ্গা সিলেটে মাজার জিয়ারত করতে চট্টগ্রাম থেকে ট্রেনে উঠেন। ফেনী রেলস্টেশনে আসার পর রোহিঙ্গাদের পরিচয় পেয়ে পুলিশ বাকিদের নামিয়ে নিলেও ট্রেনের আসনে বসে থাকায় তাকে কেউ কিছু বলেনি। শহীদ মিয়া নামে শ্রীমঙ্গলের এক যাত্রী জেহাদুলকে শ্রীমঙ্গল নামিয়ে তার বাসায় নিয়ে যান। রবিবার দুপুরে বাড়ির লোকজনদের কাছ থেকে খবর পেয়ে পুলিশ জেহাদকে থানায় নিয়ে আসে। তাকে চট্টগ্রামে রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে পাঠানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।’

এদিকে, সিলেটের দক্ষিণ সুরমার লালাবাজার থেকে আব্দুল আমিন (১৫) নামের এক রোহিঙ্গা কিশোরকে আটক করেছে পুলিশ। রবিবার রাত ৮টার দিকে তাকে আটক করা হয়।
দক্ষিণ সুরমা থানার ওসি খায়রুল ফজল সিলেটভিউ২৪ডটকমকে জানান, আটক কিশোরের নাম আব্দুল আমিন (১৫)। তার বাড়ি মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যের রেলওয়ারী উপজেলার বুজিডং গ্রামে। তার বাবার নাম আব্দুর রশিদ এবং মায়ের নাম হামিদা বেগম। লালাবাজারে ঘোরাঘুরি করার সময় স্থানীয়দের সন্দেহ হলে তারা তাকে আটক করে পুলিশে খবর দেন। পুলিশ তাকে থানায় নিয়ে আসে।

দক্ষিণ সুরমা থানায় থাকা ওই কিশোর জানায়, তিন দিন আগে কক্সবাজারের উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে তারা ৩ কিশোর পালিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। তবে দু’জন পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে সে (আব্দুল আমিন) সিলেটে চলে আসে।

এ ব্যাপারে সিলেটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শামসুল ইসলাম তালুকদার সিলেটভিউ২৪ডটকমকে বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে আমরা সতর্ক রয়েছি। তাদের কেউ যাতে সিলেটে আবাস গাড়তে না পারে, সেজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। সিলেটের কোথাও রোহিঙ্গা পেলে তাদের শরণার্থী শিবিরে ফেরত পাঠানো হবে।’

সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার জেদান আল মুসা সিলেটভিউ২৪ডটকমকে বলেন, ‘রোহিঙ্গারা যাতে সিলেট মহানগরীতে অবস্থান করতে না পারে, সে ব্যাপারে আমরা প্রচার-প্রচারণার উদ্যোগ নিয়েছি। কোথাও তাদের পেলে আমরা হেফাজতে নিয়ে টেকনাফে শরণার্থী শিবিরে পাঠাবো।’

এই পুলিশ কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের ঠেকাতে সিলেট রেলস্টেশন ও বাস টার্মিনালে আমরা নজরদারি বাড়াবো। আজ সোমবার টার্মিনালে বাস কাউন্টারগুলোতে গিয়ে সংশ্লিষ্টদের রোহিঙ্গদের বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলবো আমরা।’

এক প্রশ্নের জবাবে জেদান আল মুসা বলেন, ‘সিলেট মহানগরীর কোথাও রোহিঙ্গারা যাতে বাসা-বাড়ি ভাড়া না নিতে পারে, সেজন্য আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছি।


সুত্রঃ সিলেটভিউ২৪ডটকম