ব্রিটেনে সিলেটিদের গর্ব তামিম

2016-01-10 by  

সত্যিকার ‘অলরাউন্ডার’ সম্ভবত একেই বলে। খেলাধুলায় যেমন, পড়ালেখাতেও তেমন। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ বালক তামিম শহিদ যেন ঠিক তাই। পড়াশোনা, খেলাধুলা কিংবা শখের উড়োজাহাজ চালানো—সবকিছুতেই তার তাক লাগানো সাফল্য। জিসিএসই (এসএসসি সমমান) পরীক্ষার্থী তামিমের বয়স এখনো ১৬ পার হয়নি। এরই মধ্যে সে অনূর্ধ্ব-১৮ হ্যামার থ্রো ইভেন্টে গড়েছে বিশ্ব রেকর্ড। অলিম্পিকসহ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খেলতে ডাক পেয়েছে ‘টিম জিবি’ (যুক্তরাজ্যের জাতীয় ক্রীড়া দল) থেকে। কিন্তু খেলাধুলায় যে এত ভালো সে কি পড়াশোনায় অত মনোযোগী হতে পারে? এমন সন্দেহকে ভুল প্রমাণ করেছে তামিম। গত মাসে সে স্বীকৃতি পেয়েছে লন্ডনের সেরা শিক্ষার্থী হিসেবে। পরীক্ষার হল এবং খেলার মাঠ দুই জায়গাতেই তুখোড় পারদর্শিতার জন্য যুক্তরাজ্যের একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্কুলের গণ্ডি পার না হওয়া তামিমকে ভর্তি করে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়ে রেখেছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন এবং লন্ডনের মেয়র বরিস জনসন তামিমকে অভিনন্দন জানিয়ে লেখা চিঠিতে বলেন, ‘তুমি আমাদের দেশের গর্ব।’ এত সাফল্যের পরও তামিমের ওড়ার স্বপ্ন থেমে নেই। সে উড়োজাহাজ চালানোর প্রশিক্ষণ নিচ্ছে নিয়মিত। আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্নে বিভোর এই কিশোরের পরহিতকর ভাবনাও অসাধারণ। এই বয়সেই সে দুটি দাতব্য সংস্থার জন্য তহবিল সংগ্রহের কাজ করছে।

ডাটফোর্ডের আলো
লন্ডনের পাশের শহর কেন্টের ডাটফোর্ডের বাসিন্দা রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী আবু আবদুস শহিদ ও গৃহিণী হাজেরা চৌধুরীর একমাত্র ছেলে তামিম শহিদ। বাংলাদেশে তামিমের পৈতৃক নিবাস মৌলভীবাজারের বড়খাপন। ডাটফোর্ড গ্রামার স্কুলের শিক্ষার্থী তামিম আগামী জুন মাসে জিসিএসই পরীক্ষা দেবে। তামিমের কৃতিত্ব সম্পর্কে জানতে গত ৬ ডিসেম্বর হাজির হয়েছিলাম তাদের বাসায়। নিজের অর্জিত ডজন খানেক ক্রেস্ট আর সার্টিফিকেট দেখাতে দেখাতে তামিম একের পর এক বলে যাচ্ছিল তার সাফল্যের গল্প। সহজ-সরল আর বিনয়ী তামিমকে দেখে বোঝার উপায় নেই—এত কম বয়সেই তার এত অর্জন। সাফল্যের গল্প শোনা শেষ হওয়ার আগ থেকেই মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল, শেষ পর্যন্ত কী হতে চায় এই কিশোর? এমন প্রশ্নে কোনো দ্বিধা ছাড়াই তামিম জানাল সে মেডিসিন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নিতে চায়। তাহলে যে বিশ্ব রেকর্ড, উড়োজাহাজ চালনা? এ সবই শখের বশে।
তামিমের প্রাধান্য সত্যিই পড়ালেখায়। তা না হলে অলিম্পিকে খেলার সুযোগ কী কেউ হাতছাড়া করে? হ্যামার থ্রোয়িংয়ে (গোলক নিক্ষেপ) ছয়বার ডিস্ট্রিক্ট চ্যাম্পিয়ন এবং দুবারের কাউন্টি চ্যাম্পিয়ন তামিম গত আগস্ট মাসেই ডাক পেয়েছে টিম জিবি (বৃটেন) থেকে। কথা ছিল ২০১৬ সালে নরওয়েতে অনুষ্ঠেয় ‘ইয়ুথ অলিম্পিকস গেমস’-এ খেলার। সামনে জিসিএসই পরীক্ষার কথা ভেবে সে প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছে তামিম। তার যুক্তি—অলিম্পিকে খেলার সুযোগ হয়তো আরও আসবে। কিন্তু পড়ালেখায় ছন্দপতন ঘটলে মেডিসিনে পড়ার স্বপ্নটাই হয়তো হোঁচট খাবে। তবে টিম জিবির নিয়মিত সদস্য হিসেবে আছে তামিম। স্কুলের ক্রীড়া শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে চলে তার নিয়মিত প্রশিক্ষণ। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ২০১৭ সালে লন্ডনে অনুষ্ঠিতব্য ‘ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ ইন অ্যাথলেটিকস’ আসরে সে অংশ নেবে।

তামিমের বিশ্ব রেকর্ড

৪ ফুট লম্বা দড়ির এক মাথায় বাঁধা ৬ কেজি ওজনের একটি গোলক। দড়ির অপর প্রান্ত ধরে গোলকটি ঘুরিয়ে তীব্র গতিতে ছুঁড়ে দেওয়াই হ্যামার থ্রো। ২০১২ সালে ডাটফোর্ড গ্রামার স্কুলের ক্রীড়ানুষ্ঠানে খেলাটি নতুন যুক্ত হয়। তামিম তখন ‘ইয়ার সেভেন’-এর ছাত্র। স্কুলের ক্রীড়ানুষ্ঠানে যখন হ্যামার থ্রোর জন্য পর্যাপ্ত প্রতিযোগী পাওয়া যাচ্ছিল না, তখন শিক্ষকের চাপাচাপিতে এক রকম বাধ্য হয়েই তামিম হ্যামার থ্রোয়িংয়ে নাম লেখাল। ওই প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় হয়ে তামিম ক্রীড়াশিক্ষকের নজর কাড়ে। এরপর ডিস্ট্রিক্ট ও কাউন্টি পর্যায়ে জয় করতে থাকল একের পর এক শিরোপা। হ্যামার থ্রোয়িংয়ে তামিমের হাতের জাদুর খবর স্কুল থেকে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল ‘ওয়ার্ল্ড মাস্টার্স অ্যাথলেটিকস’-এর (ডব্লিউএমএ) কাছে। গত ১৪ সেপ্টেম্বর ডব্লিউএমএর কর্মকর্তারা ডাটফোর্ডে এলেন তামিমের দক্ষতা যাচাইয়ে। ডাটফোর্ড প্যাভিলিয়নে সেদিন তামিমের ছুড়ে মারা ৬ কেজি ওজনের হ্যামারটি গিয়ে পড়ল ৮৬ দশমিক ৮ মিটার দূরে। আগের রেকর্ডের চাইতে দশমিক ৪ মিটার ব্যবধানে অনূর্ধ্ব-১৮ হ্যামার থ্রোয়িংয়ে তামিম গড়ে বিশ্ব রেকর্ড। তামিম পায় রেকর্ডের স্বীকৃতিও।
হ্যামার থ্রোয়িং তামিমকে আরও অনেক কিছু দিয়েছে। গত ১৬ নভেম্বর বার্মিংহামে অনুষ্ঠিত ডব্লিউএমএ চ্যাম্পিয়নশিপের চূড়ান্ত পর্বে ১১ দেশের প্রতিযোগীকে পরাজিত করে তামিম শিরোপা জয় করে। ওই শিরোপার পাশাপাশি সেখানেই তামিমকে যুক্তরাজ্যের ‘ন্যাশনাল অ্যাথলেটস অব দ্য ইয়ার’ ঘোষণা করা হয়।
সেরা শিক্ষার্থীর স্বীকৃতি আর ক্রীড়াঙ্গনের সাফল্যের রেশ কাটতে না কাটতেই ২৬ নভেম্বর তামিলের স্কুলশিক্ষক তার হাতে একটি রহস্যময় চিঠি ধরিয়ে দিলেন। চিঠি খুলে তামিম তো অবাক! প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন, লন্ডনের মেয়র বরিস জনসন এবং ব্রাইট আইডিয়াজ ট্রাস্টের চেয়ারম্যানের লেখা যৌথ ওই চিঠিতে তামিমকে লন্ডনের ‘সেরা শিক্ষার্থী’ (ইয়ার ৯-১১ বিভাগে) হিসেবে ভূষিত করা হয়েছে। তাকে তার স্কুল, কমিউনিটি এবং সর্বোপরি দেশের গর্ব বলে অভিহিত করা হয় ওই চিঠিতে। খেলায় বিশ্ব রেকর্ড গড়ার পাশাপাশি স্কুল পরীক্ষায় সব বিষয়েই তার ‘এ স্টার’। গত ২ ডিসেম্বর যুক্তরাজ্যের একটি শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয় জিসিএসই এবং এ লেভেল শেষ করলে তারা তামিমকে ভর্তি করে নিতে আগ্রহী। বিশ্ববিদ্যালয়টির নাম প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তামিম জানাল, পড়া আর খেলার বাইরে মাসে দুদিন করে সে উড়োজাহাজ চালানোর প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। ইতিমধ্যে তার ১০ ঘণ্টার উড্ডয়ন শেষ হয়েছে। দাতব্য কাজেও আছে তামিমের প্রচণ্ড আগ্রহ। ক্যানসার রিসার্চ ইউকে এবং টিন এইজ ক্যানসার ট্রাস্টের জন্য আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যে চার হাজার পাউন্ড তহবিল সংগ্রহের চ্যালেঞ্জে নেমেছে সে। স্কুলপড়ুয়া এই কিশোরের পক্ষে এত কিছু সামাল দেওয়া কীভাবে সম্ভব হয়? অনেকটা বড়দের মতো করে তামিমের জবাব—আসল ব্যাপার হলো সময় ব্যবস্থাপনা। প্রচণ্ড ইচ্ছা শক্তি যদি থাকে, আর সেই ইচ্ছাপূরণে একাগ্রতা নিয়ে যদি সময় দেওয়া যায়, অনেক কিছুই অর্জন সম্ভব। তবে কিশোর বয়সীদের জন্য মা-বাবার সমর্থন খুবই জরুরি বলে মনে করে তামিম। সে স্কুল শেষ করে চার দিন জিমে যায়, তিন দিন করে হ্যামার থ্রোয়িং অনুশীলন। প্রতি শনিবার আছে ইসলামি সাহিত্য ও আরবি শিক্ষার ক্লাস। বাবা আবদুস শহিদ বলেন, তামিম সব সময় ভালো কিছুই করতে চায়। ফলে তার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করার কিছু থাকে না। তারা সব সময় তামিমের পড়াশোনা এবং অনুশীলনের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেন। এসবের জন্য তাদের দিনের অনেক সময় ব্যয় করতে হয়। ছেলে ‘১ নম্বর’ নয়, একজন ‘ভালো মানুষ’ হোক—সেটাই মা বাবার আসল চাওয়া।

সংগ্রহ: প্রথম আলো